|    
   
   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  
 


 
সদস্য হোন
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
 
 
  
চারা উত্পাদন করে স্বাবলম্বী

সবজির চারা উত্পাদন করে জয়পুরহাট জেলার পারুলিয়া গ্রাম এখন ‘চারা গ্রাম’ নামে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। সবজির চারা উত্পাদন। এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। কৃষকরা নিজেদের প্রয়োজনে ফসলের চারা উত্পাদন করে থাকেন। এখানে চারা উত্পাদনকারীরা তিন পুরুষ ধরে এ কাজে নিয়োজিত আছেন। এ ব্যবসায় কেউ কেউ লাখপতি হয়েছেন। বাড়ি, পুকুর, জমাজমি কিনে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। আবার কেউ তেমন লাভবান না হলেও পেশা হিসেবে উত্তরাধিকার সূত্রে চালিয়ে যাচ্ছেন চারা ব্যবসা। লাভজনক এ চারা উত্পাদনের এ ব্যবসায় ঝুঁকে পড়ছেন গ্রামের অন্যান্য কৃষিজীবীও। ৭০ বছর আগে এ গ্রামে ব্যবসায়িকভাবে চারা উত্পাদন শুরু করেন বর্তমানে মা নার্সারির মালিক ইসমাইল হোসেনের বাবা মৃত আ. সাত্তার মণ্ডল।

ভিটে জমিতে সবজির বীজতলার জন্য তিনবার জমি চাষ করে মই দিতে হয়। এরপর ছয় ফুট দৈর্ঘ্য দুই ফুট চওড়া বেড তৈরি করতে হয়। প্রতি বেডে এক মণ গোবর সার দেয়ার পর কমপক্ষে তিনবার কোদাল দিয়ে কুপিয়ে নিতে হয়। এ ছাড়া প্রতি বেডে ইউরিয়া, ফসফেট, পটাশ সারের হাফ কেজি মিশ্রণসহ ২০০ গ্রাম কিটনাশক (ফুরাডন) ব্যবহার করে বীজতলার জন্য বেডগুলো তৈরি করতে হয়। রোদ, বৃষ্টি, শিশির থেকে চারাকে রক্ষার জন্য বেডের ওপর বাঁশের কাভারি ভাঁজ করে পুঁতে দেয়া হয়। তার ওপর নীল রংয়ের পলিথিনের ছাউনি, যা প্রয়োজনমতো খোলা যায়। এরপর বীজ পেতে কঠিন পরিচর্যা করতে হয়। চারাগাছের চাহিদানুসারে সময়মতো সার, কীটনাশক ও সেচ দিতে হয়। চার সপ্তাহের মধ্যে চারাগাছ তৈরি হয়।

পারুলিয়া গ্রামে ছোট-বড় ১৪টি বীজতলার নার্সারি রয়েছে। এসব নার্সারির মালিকরা হলেন ইসমাইল হোসেন, তার ছেলে একরামুল হক, ইমানুর রহমান, জামাতা হারুনার রশিদ, আব্দুল ওয়াহাব, আমিনুর ইসলাম, মোয়াজ্জেম হোসেন, মোকলেছ, মোস্তফা, মাকফুজুল, শহিদুল, আব্দুল ওয়াহেদ, ক্ষিতিশ চন্দ্র মণ্ডল ও তার ছেলে জীবন কুমার মণ্ডল। প্রবীণ ব্যবসায়ী ৭০ বছর বয়সী ইসমাইল হোসেন জানালেন, পৈতৃক সূত্রে এ পেশায় জড়িত আছি। পাকিস্তান আমলে আমার বাবা মৃত আ. সাত্তার চারা বিক্রির ব্যবসা করতেন। স্বাধীনতার পর বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চারা উত্পাদন শুরু করেন। এ ব্যবসা করেই সংসার চালাচ্ছি, ছেলেমেয়েদের বিয়ে-শাদি দিচ্ছি। আমার দুই ছেলে একরামুল ও ইমানুর এবং জামাই হারুনুর রশীদ চারার ব্যবসা করছেন। মা নার্সারিটি ছেলে ও জামাই সবাই মিলে দেখাশোনা করছে। নিজের জমাজমি নেই। অন্যের জমি লিজ নিয়ে দীর্ঘদিন এ ব্যবসা চালিয়ে আসছি। প্রায় দুই একর জমির ওপর চারার চাষ করে আসছি। চারাতে পচন ধরায় গত বছর আমার এ ব্যবসায় কোনো লাভ হয়নি। এ বছর বাজারদর ভালো। ব্যবসায় লাভের আশা পোষণ করছি।

কথা হয় সেবা নার্সারির প্রতিষ্ঠাতা ক্ষিতিশ চন্দ্র মণ্ডলের সঙ্গে। তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ৩০ বছর ধরে তিনি এ ব্যবসা করে আসছেন। ব্যবসা শুরু সময় তার মাত্র দুই-তিন বিঘা জমি ছিল। ফসলি জমির সঙ্গে চাষাবাদ ও ব্যবসা করে তিনি স্বাবলম্বী হয়েছেন। পাঁচ বিঘা জমি কিনেছেন। দুটি পাকা বাড়ি ও একটি পুকুর করেছেন। মেয়ের বিয়েতে এক লাখ টাকা খরচ করেছেন। বড় ছেলে জীবন কুমার নার্সারি চালায়। ছোট ছেলে জয়পুরহাট সরকারি কলেজে অনার্সে পড়ে। তিনি জানান, খরচাপাতি বাদে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা আয় হয়। তিনি আরও বলেন, জয়পুরহাট ছাড়াও বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর, সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহীতে চারা সরবরাহ করে থাকি।

মা নার্সারির অংশীদার হারুনুর ও একরামুল জানান, বর্তমানে শ্রমিকের মজুরি অনেক বেশি। একজন মজুরকে প্রতিদিন দেড়শ’ টাকা মজুরিসহ একবার খাবার দিতে হয়। স্থানীয় হাটবাজারসহ আশপাশের বগুড়ার মোকামতলা, শিবগঞ্জ, জয়পুরহাটের পুনট, কালাই, পাঁচবিবি, জামালগঞ্জ, হোপেরহাটে চারা বিক্রি করে থাকি। পাইকার আসে নাটোর, বগুড়া, দিনাজপুরের হিলি, বিরামপুর, ফুলবাড়ি, রাজশাহীর নলডাঙ্গা, নওগাঁর ধামুরহাট, নজিরপুরসহ আরও অনেক স্থান থেকে। প্রবীণ ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন বলেন, চিটাগাং থেকে পাইকার এসে আমার নার্সারি থেকে চারা কিনে নিয়ে যাচ্ছে। সমস্যার কথা বলতে গিয়ে এসব নার্সারির মালিকরা জানান, চারা উত্পাদনের সবচেয়ে ঝুঁকি পচন রোগ। পচন রোধ করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। চারাতে পচন ধরলে সে বছর ব্যবসা লাটে উঠে। ব্যবসায় লোকসান হয়। জমি ভাড়া প্রতি বিঘা বছরে ছয় থেকে সাত হাজার টাকা দিতে হয়। এ ছাড়া এনজিওদের চড়া সুদের ঋণ নিয়ে ব্যবসা পোষায় না।

জয়পুরহাট সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা এসএম নুরুজ্জামানের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ। আশপাশের কোনো জেলায় এক গ্রামে চারা উত্পাদনকারী এতগুলো নার্সারি নেই। নিঃসন্দেহে এটি একটি ভালো উদ্যোগ ও লাভজনক ব্যবসা। এতে কৃষকদের চারা উত্পাদনের আলাদা কোনো সময় নষ্ট করতে হয় না। যারা উদ্যোগ নিয়ে চারা উত্পাদন করেন তারা একটি নতুন ব্যবসার পথ উন্মোচন করেছেন। পচন রোগের সমস্যা সম্পর্কে তিনি বলেন, নার্সারি মালিকরা অনেক সময় বীজ শোধন না করে বীজতলা তৈরি করেন। আমাদের অজ্ঞাতসারে তারা এ কাজ করে ক্ষতির সম্মুখীন হন। শোধন করা বীজ বীজতলায় পাতলে পচন রোগের আশঙ্কা থেকে চারা রক্ষা করা যায়। এসব নার্সারিতে সারা বছর চারা উত্পাদন হয়। পারুলিয়া এখন চারা গ্রাম হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। চারা নার্সারি চালু হওয়ার ফলে শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ মিলছে। এসব নার্সারিতে গড়ে প্রতিদিন শতাধিক শ্রমিক কাজ করছেন।

আরো সফল কৃষক: